Tuesday, July 23, 2024
HomeIslamic"গবাদি পশু কুরবানির আগে মনের পশু কুরবানি দিন"

“গবাদি পশু কুরবানির আগে মনের পশু কুরবানি দিন”

আরিফ বিন ছালেহ্ঃ

আজাদের মন ভীষণ খারাপ। বাবা বারবার বোঝাবার চেষ্টা করেন, কিন্তু কিছুতেই বুঝতে চাই না। হন হন করে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। ঈদের পর স্কুল খুললে স্যারেরা জিজ্ঞেস করবে কারা কি কুরবানি দিয়েছে, সেখানে হাসানের কাছে ছোট হয়ে যাবে আজাদ৷

ওর বাবা হাটের সবচেয়ে বড় গরুটি কিনছে। আর আজাদের বাবা সাত জনে একটা গরু কুরবানি দিচ্ছেন। লজ্জার কথা কারণ আজাদ আর হাসান একই ক্লাসের ছাত্র।

বাড়িও একই এলাকায়। হাসানের বাবা গ্রামের মহাজন/মাতাব্বর। প্রতি বছর দামি গরু কুরবানি দেন। এবার কিনছেন হাটের সেরা গরু।

টেলিভিশনে ছবি দেখে স্বামী-স্ত্রী মিলে চয়েজ করেন গরুটি৷ কুরবানির গরু তাই বিক্রেতা যে দাম হাঁকেন সে দামেই কিনে নেন হাসানের বাবা। হাট থেকে ফিরে বাড়ির সামনে মেইন রোড়ের পাশে বেঁধে রাখেন গরুটা।অনেকেই দেখতে আসে। পথচারীরা দাঁড়িয়ে যান গরুটি দেখতে। আর আজাদের গরু? যেন হাতি আর ভেড়া।

একটির সাথে আরেকটির তুলনা করা যায় না। আজাদ শুয়ে শুয়ে ভাবে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠে দুটি গরুর চেহারা। হঠাৎ মা ডাক দেয় কিরে পড়তে বসবি না? না। না মানে ! অসুখ লাগতেছে? বলেই ছেলের কপালে হাত দেয় ফরিদা বেগম। কই কিছুইত হয়নি৷ উঠ ঈদের পর লকডাউন খুলতে পারে পড়ায় অনেক গ্যাপ থেকে গেছে পড়তে বস্। আজাদের বাবা মোহাম্মদ আলী বসেছিলেন বারান্দায়। খাজনা , চা , নাশতা , পরিবহন ব্যায় মিলে গরুটার পিছনে কতটাকা খরচ হয়েছে তার হিসাব করছিলেন। বারান্দা থেকেই স্ত্রীর কথার জবাব দেন মোহাম্মদ আলী।

আমাদের গরু ওর পছন্দ হয়নি, তাই মনটা খারাপ৷ কেন কি হয়েছে? আজাদ রাগ কন্ঠে বলে কি হবে, আর সাত জনে মিলে একটা পিচ্ছি বাচুর কিনছো। পারলে হাসানদের গরুটা দেখে এসো! কত মানুষ দেখতে আসছে। ফারিদা বেগম বলেন, ওরা বড় লোক পয়সার অভাব নেই তাই বড় গরু কিনছে।

আমরা কিনছি আমাদের সামর্থ্যনুযায়ী। তাতে সমস্যা কি? তোমরা যদি বাইরে যেতে তাইলে বুঝতে সমস্যা কোথায়। ছোট গরু কুরবানি দেয়ার কথা উচু করে বলা যায় না, তাতে মানুষের কাছে ছোট হতে হয়। স্ত্রীর মত একই সূরে কথা বলে মোহাম্মদ আলী। কুরবানি আল্লাহর হুকুম৷ যার যেমন সামর্থ্য, তার তেমন কুরবানি দিতে হয়।

যার পশু কেনার টাকা নাই তার কুরবানি দেয়া জরুরি নয়। আজাদ কোন কথা না বলেই পড়তে বসলো। পর দিন জুমাবার আজাদের মন তেমন ভালো নেই, তাই সেই তাড়াতাড়ি মসজিদে চলে যায়। ইমাম সাহেব প্রতি জুমা’আর নামাজে ভিবিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। আজকের বিষয় ছিল কুরবানি নিয়ে।

ইমাম সাহেব বলেন, কালো টাকা দিয়ে বড় বড় উট বা গরু কুরবানির চেয়ে, সাদা টাকা দিয়ে ছাগল কুরবানি দেয়ায় শ্রেয়। লোক দেখানোর উদ্দেশ্য যত দামি পশুই কুরবানি দেয়া হউক, তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।

ইমামের কথা আজাদকে ভাবিয়ে তুলে কিছু কিছু বুঝলেও কালো আর সাদা টাকা বুঝে নাই। তবে সেই সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারে নাই। কথা গুলো তার মনে বার বার নাড়া দেয়।

হঠাৎ বিকালে হুজুরকে একা দেখে আজাদ জিজ্ঞেস করে ,হুজুর সাদা টাকা আর কালো টাকা কি?

হুজুর বলেলন , যে অর্থ কর ফাঁকি দিয়ে ইনকাম করা হয় তাকে কালো টাকা বলে। তিনি আরো বিশ্লেষণ করে বলেন , সমাজের যেই সমস্ত ধনী সুদ, ঘোষ, ইয়াবা, মদ ,গাঁজা ,আসহায় মানুষকে মেরে খায় সেই টাকাকে কালো টাকা বলে। আজাদের বুঝে আসলো সেই ভাবলো হাসানের বাবা বিভিন্ন অপকর্ম করে টাকা ইনকাম করে। এমন কি ধর্ষণকারীদেরও আশ্রয় দেয় ,বিচারের নামে টাকা নেয় ,ত্রাণের টাকা মেরে খায়।

রাতে সবার সাথে খেতে বসল আজাদ। বাবাকে না দেখে আজাদ বলে বাবা কই! হঠাৎ বাবা আসলে আজাদ বলে বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও।

আমি ভূল করে ফেলছি। কী ভূল? কিসের ক্ষমা? ছেলের কথার আগা মাথা বুঝতে পারেনি স্বামী-স্ত্রী।

আজাদ বল্লো, তোমরাই সঠিক, আল্লাহর কাছে হাসানের গরুর কোন দাম নাই, আমাদের গরুটায় বেশি দামী।

আজাদের কথায় তারা দু’জনই আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।

আসুন আমরা আগে মনের পশুকে কুরবানি দিই , আমাদের মন থেকে হিংসা ,বিদ্বেষ ,অহংকার দূরীভূত করি। লোভ-লালসা থেকে নিজেকে বিরত রাখি।

তাহলে গবাদি বা বনের পশু কুরবানি দেয়া সহজ ও কার্যকর হবে। নিজের আত্মা পরিশুদ্ধ না করে বড় বড় পশু জবাই করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই।

আল্লাহ সকলকে আমল করার তৌফিক দান করুক। আমিন।

আরিফ বিন ছালেহ- কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী।
অর্থনীতি বিভাগ-
চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ।

Related News
- Advertisment -

Popular News

error: Content is protected !!