মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৬, ২০২২
Homeখবরকুমিল্লার মন্ডপে কিভাবে কোরআন শরীফ আসলো

কুমিল্লার মন্ডপে কিভাবে কোরআন শরীফ আসলো

কুমিল্লার মন্ডপে যেভাবে কোরআন শরীফ আসলো…

রাত ১০টা: পূজা শেষে বাসায় ফেরেন এই অস্থায়ী পূজামন্ডপের পুরোহিতের দায়িত্ব পাওয়া শিমুল ও রাজিব। তখন কোরআন ছিল না।

রাত ১২টা ৩০ মিনিট: পূজা কমিটির সভাপতি সুবোধ রায় বন্ধুদের সাথে মন্ডপে আড্ডা দিয়ে সারে ১২টায় বাসায় যান। পূজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন তরুণ কান্তি মোদক। তিনিও একই সময় নৈশপ্রহরী শাহিনের কাছে মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরেন। তখন কোর-আন ছিল না।

রাত ২টা ৩০ মিনিট: সাধারণ ছেলে ভক্তসহ সকলেই মন্ডপ ছেড়ে নিজ নিজ বাসায় চলে যান। মন্ডপে নৈশপ্রহরী শাহিন একা পাহারায়। তখন কোর-আন ছিল না।
এবার এই শাহিনের একটু পরিচয় দেওয়া যাক। শাহিন অ্যালার্ট সিকিউরিটিজ অ্যান্ড অ্যাটেনডেন্ট সার্ভিসেস নামের নিরাপত্তাসেবা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ৪৫ বছর বয়স্ক শাহিনের বাসা নগরীর সংরাইশ এলাকায়।

অ্যালার্ট সিকিউরিটিজ অ্যান্ড অ্যাটেনডেন্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপক শাহাজাদা ইকরাম রিপন বলেন,

“বছর দুয়েক আগে শাহিন আমাদের কোম্পানিতে চাকরি নেয়। পরে আবার চাকরি ছেড়ে দেয়। তবে মাস দেড়েক আগে সে আবার আমাদের কোম্পানিতে যোগ দেয়। মাঝে সে কোথায় ছিল আমরা জানি না।”

শাহিন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিএনপির মিছিল মিটিংয়ে দেখা যেত তাকে। এর বেশি কিছু আমি জানি না।”

রাত ৩টা: পূজামন্ডপের পাশেই পরিবার নিয়ে থাকেন মনিরুজ্জামান। তিনি জানান, রাত ৩টার দিকে হঠাৎ দমকা বাতাস বইতে থাকে। এ সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। এর পরেই নানুয়ার দিঘির পাড় এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মন্ডপে নৈশপ্রহরী শাহিন ছিল কি না বলতে পারি না।

রাত ৩টা থেকে সকাল ৬টা ৩০ মিনিট: ভোরবেলায় স্থানীয় এক ব্যক্তি কোর-আন শরিফটি রেখে যান মন্ডপে। এ সময় হনুমানের হাতের গদাটি সরিয়ে নেন তিনি। গদা হাতে তার চলে যাওয়ার দৃশ্যও ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।

সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মন্ডপে পূজা দিতে আসে দুজন নারী ভক্ত। তারাই প্রথম কোর-আনটি দেখতে পান। যখনই দুই নারী ভক্ত কোর-আন শরীফটি দেখতে পান, তখনই সেখানে বিস্ময় প্রকাশ করে ছুটে আসেন ইকরাম হোসেন নামে একজন। মন্ডপে এসে চিৎকার করে বলেন, “হনুমানের পায়ের কাছে কোর-আন, কেউ এখানে থাকবেন না। আর যে কোর-আন এখান থেকে সরিয়ে নেবে তার হাত কেটে ফেলা হবে।”

ইমরানের এই কথা গুলো দুই নারী ভক্ত সহ চিনু রানি নামের একজন মহিলাও শুনতে পান। তিনিও মন্ডপের পাশেই ছিলেন।

সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৭টা: ইকরাম ৯৯৯-এ কল করেন। ইমরানের সাথে নারীভক্তদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা শুরু হয় এবং আশেপাশের মানুষ আসতে থাকে। প্রায় ৩০-৪০ জন মানুষ মুহুর্তেই উপস্থিত হন। এরমধ্যে ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি কোর-আন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান। সেই সাথে নৈশপ্রহরী শাহিনকেও নিয়ে যান।

এবার এই ইকরামের বিষয়ে একটু জানা যাক। ইকরাম নগরীর কাশারিপট্টির রিকশাচালক বিল্লাল হোসেনের ছেলে। ইকরাম বিবাহিত হলেও স্ত্রীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। মাদকাসক্ত হওয়ায় তিনি পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন। ইকরাম পাইপ মিস্ত্রির কাজ করেন।

পূজা মন্ডপে আক্রমণ ও ঘটনার পর্যবেক্ষণ: ওসি আনওয়ারুল আজিম মণ্ডপ থেকে কোর-আন উদ্ধারের সময় সেটি ফেসবুকে লাইভ করেন ফয়েজ নামের এক যুবক। সেই লাইভের পরেই উত্তেজিত মানুষ জড়ো হন ঘটনাস্থলে, একপর্যায়ে শুরু হয় সহিংসতা, ভাঙচুর।

স্পর্শকাতর ইস্যুতে ফয়েজ ফেসবুক লাইভের সুযোগ কীভাবে পেলো?” এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে ওসি আনওয়ারুল আজিম বলেন, “আমি তখন মোবাইল ফোনে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে ব্যস্ত ছিলাম। এ সময় ৩০-৪০ জন ঘটনাস্থলে ছিল, তাই কে লাইভ করছে খেয়াল করতে পারিনি।”

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের ধারণা কোর-আন শরীফটি আনা হয় মন্ডপের পাশের একটি মাজার থেকে।

শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান, মন্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর বারান্দায় দর্শনার্থীদের তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোর-আন শরিফ।

রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন। হনুমানের কোলে যে কোরা-আন পাওয়া যায়, সেটি মাজারে রাখা কোর-আনের মতই।

এই মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একজনের নাম হুমায়ুন কবীর (২৫), আরেকজনের বিষয়ে তথ্য পেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দারোগাবাড়ী মাজারের খাদেম আহামুদ্দুন্নাবী মাসুক জানান,

“হুমায়ুন মাজারে এসে নামাজ আদায় করতেন। তার বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দেওরা এলাকায়। ঘটনার পরদিনই তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। এ ছাড়া মাজারে আরও দুই-একজন নামাজ আদায় করতেন। তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।”

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, “মাজারে নিয়মিত যাওয়া ওই তিন যুবকই মণ্ডপে কোর-আন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দুজনকে আমরা আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে।

আমরা সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। তবে তৃতীয় যুবককে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ তিনিই সরাসরি মণ্ডপে কোর-আন রেখেছিলেন। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “কুমিল্লায় সহিংসতার মূল অভিযুক্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। শিগগিরই তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। আমরা তাকে ধরব। কেন এই কাজ করেছে, তার জবাব দিতে হবে। আপনাদের জানাব।”

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর

1 COMMENT

Comments are closed.

জনপ্রিয় খবর

error: Content is protected !!